আইন ও মানবতার অনবদ্য জয়: অপবাদ ও অন্ধকারের মেঘ কেটে উজিরপুরের অদম্য তুবা এখন ক্লাসরুমে
মোহাম্মদ উল্যা
বিশেষ প্রতিনিধি
কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।
অন্যায়, নির্যাতন আর অপবাদের এক নির্মম অন্ধকারের বুক চিরে অবশেষে উদিত হলো পরম স্বস্তি ও মানবতার এক নতুন সূর্য। চুরির মিথ্যা অপবাদে খুঁটিতে বেঁধে রাখা বাবার অবলা ও অসহায় মুখে পরম মমতায় চা-রুটি তুলে দিয়ে যে ৯ বছরের বালিকা পুরো বাংলাদেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই তুবা বিনতে অরণির মুখে আজ কোটি টাকার হাসি। উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের সময়োপযোগী ও অভূতপূর্ব মানবিক হস্তক্ষেপে সব সামাজিক বাধা ও মানসিক ট্রমা পেরিয়ে আবারও স্কুলের আঙিনায় পরম আনন্দে ফিরেছে চতুর্থ শ্রেণির এই খুদে শিক্ষার্থী।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও দেখে স্তম্ভিত ও ব্যথিত হয়েছিল পুরো দেশ। রিকশাচালক বাবা অনিক সরদারকে নির্যাতনের চরম মুহূর্তে শিশু তুবার সেই অদম্য মায়াজাল ও সাহসিকতা যেমন মানুষের চোখে জল এনেছিল, তেমনি নাড়া দিয়েছিল সামাজিক ন্যায়বিচারের চেতনাকে। পারিবারিক সংকট, চরম মানসিকভাবে ভেঙে পড়া আর একটিমাত্র স্কুল ড্রেসের অভাবে টানা চার মাস ধরে স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্রীর। দিন দিন অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছিল তার শৈশব ও শিক্ষা জীবন।
তবে সামাজিক এই নির্মমতার কাছে অবলা শিশুটিকে হেরে যেতে দেননি উজিরপুরের মানবিক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলী সুজা। শিশুটির চরম সংকটের কথা জানতে পেরে তিনি নিজ উদ্যোগে নতুন স্কুল ড্রেস, জুতো, বই-খাতা ও শিক্ষাসামগ্রী নিয়ে সরাসরি হাজির হন তুবার জীর্ণ কুটিরে। শুধু উপহার পৌঁছে দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেননি এই প্রশাসনিক কর্মকর্তা; গত বৃহস্পতিবার সকালে ইউএনও মো. আলী সুজা নিজে তুবার কোমল হাত ধরে তাকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে দেন তার প্রিয় বামরাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
স্কুল প্রাঙ্গণে সে সময় রচিত হয় এক অপূর্ব ও রোমাঞ্চকর পরিবেশ। দীর্ঘ চার মাস পর রাজকন্যার মতো নতুন ড্রেস পরে যখন তুবা স্কুলের প্রবেশদ্বার দিয়ে ক্লাসরুমের দিকে এগোচ্ছিল, তখন প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষকবৃন্দ এবং তার সব সহপাঠী বন্ধুরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তুমুল করতালি দিয়ে তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। দীর্ঘদিন পর প্রিয় বন্ধুদের মাঝে ফিরে এসে তুবার মুখে ফুটে ওঠা সেই চওড়া ও স্বস্তির চেনা হাসি যেন এক নিমিষে ধুয়ে-মুছে দেয় পেছনের সব গ্লানি ও তিক্ত অভিজ্ঞতা।
তুবার ভবিষ্যৎ জীবনকে নিরাপদ ও সুসংহত করতে উপজেলা প্রশাসন গ্রহণ করেছে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। দেশ-বিদেশ থেকে আসা সহায়তার অর্থ সুরক্ষিত রাখতে তার নিজস্ব নামে একটি স্থায়ী ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেন ভবিষ্যতে অর্থসংকটে তার পড়াশোনা কখনো থমকে না যায়। একই সঙ্গে তুবার সম্পূর্ণ শিক্ষা জীবনের সার্বিক দায়িত্ব ও গ্যারান্টি বহন করছে উপজেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে, চরম অবমাননা ও সামাজিক নিপীড়নে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত তুবার বাবা অনিক সরদারকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তিন মাসের জন্য পাঠনোর ব্যবস্থা করা হয়েছে রিহ্যাব সেন্টারে। চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় থেরাপি শেষে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফিরলেই তাকে একটি নতুন অটোভ্যান প্রদানসহ স্থানীয়ভাবে সম্মানজনক উপার্জনের স্থায়ী ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।
যেখানে একটি প্রভাবশালী ও স্বার্থান্বেষী চক্র অন্যায্যভাবে পরিবারটিকে গ্রামছাড়া করার হুমকি দিচ্ছিল, সেখানে তুবার অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং প্রশাসনের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ অন্ধকারের বুক চিরে ছড়িয়ে দিল নতুন আশার প্রদীপ। উজিরপুর উপজেলা প্রশাসনের এই প্রশাসনিক ও মানবিক উদ্যোগ কেবল একটি নিষ্পাপ শিশুর শিক্ষা জীবনকেই পুনর্বাসন করেনি, বরং দেখিয়ে দিল যে সত্য, সহমর্মিতা ও সময়োপযোগী বিচারিক সদিচ্ছা থাকলে যেকোনো সামাজিক অন্ধকার কেটে আলোর আগমন ঘটবেই।
আইন ও মানবতার অনবদ্য জয়: অপবাদ ও অন্ধকারের মেঘ কেটে উজিরপুরের অদম্য তুবা এখন ক্লাসরুমে
📷 ছবি: সংগৃহীত