অর্থনীতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, চার মাসেও বিতরণে ধীরগতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, চার মাসেও বিতরণে ধীরগতি
📷 ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা, চার মাসেও বিতরণে ধীরগতি

বেসরকারি খাতকে সহায়তা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা স্কিমে চার মাসেও প্রত্যাশিত গতি আসেনি। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ফান্ড সংগ্রহে চুক্তি হলেও অর্থ বিতরণের ধীরগতি স্পষ্ট। তবে ব্যাংকগুলোর দাবি, এসএমই ও কৃষি খাতে প্রণোদনার ঋণ বিতরণ শুরু হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যাতে এই সুবিধা পান, বাংলাদেশ ব্যাংককে তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রণোদনার অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হলে এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।

গত মে মাসে বেসরকারি খাতকে সহায়তা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে দেওয়ার কথা। এ লক্ষ্যে ফান্ড সংগ্রহের জন্য বন্ধ শিল্প ও সেবা খাতে ১৭টি এবং কৃষি ঋণের জন্য ৪৩টি ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বিভিন্ন খাতে সোনালী ব্যাংক সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা এবং রূপালী ব্যাংক ১ হাজার ২৫৯ কোটি টাকার ফান্ড গঠনে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও ঋণ বিতরণ কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও প্রত্যাশিত গতি না আসার চিত্র পাওয়া গেছে। বরাদ্দের ৬০ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৫টি খাতে প্রক্রিয়াধীন ও বিতরণকৃত অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকে অনেক আবেদন চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগ সেগুলো প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখেছে এবং বিতরণও শুরু হয়েছে।’

সোনালী ব্যাংকের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে তারা অন্তত ১ হাজার কোটি টাকার আবেদন পেয়েছে। অগ্রণী ব্যাংক জানিয়েছে, সিএমএসএমই খাত ও কৃষিতে প্রায় ৩০০ জনকে ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা দেওয়ার দাবি করেছে। ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, বড় অঙ্কের আবেদনের ক্ষেত্রে প্রস্তাবকারীর ঋণের অবস্থান যাচাই করা হচ্ছে।

অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারসোমা আলম বলেন, ‘ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটা ভালো একটা সুযোগ। তারা এখন এগিয়ে আসছে, তারা শাখায় যোগাযোগ করছে এবং প্রস্তাব আসছে। আমরা এগুলো যাচাই-বাছাই করে যত দ্রুত সম্ভব আমরা দেয়ার চেষ্টা করছি।’

সোনালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান বলেন, ‘যারা প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণের জন্য আবেদন করেছেন, তাদের বেশিরভাগই কিন্তু এখনও কিন্তু তাদের ঋণগুলো অনিয়মিত আছে। সেগুলা আগে নিয়মিতকরণ করতে হবে, এরপরে কিন্তু প্রণোদনার আওতায় ঋণ দেয়া যাবে।’

এদিকে ঘোষিত প্রণোদনা স্কিমে হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যাংকের শর্ত পূরণ করতে গিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ বিষয়ে সরকারের নীতি সহায়তাসহ গ্রাহকদের নিয়ে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের দাবি জানিয়েছেন তারা।

টোটালফুড প্রসেসিং প্রাইভেট লিমিটেডের পরিচালক অধ্যাপক মেহেদী রহমান বলেন, ‘নীতিগত কিছু সমস্যা আছে। ত্রিমুখী সমস্যা আছে। এই যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, কর্মাশিয়াল ব্যাংক এবং গ্রাহকদের মধ্যে মিটিং হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক কি ছাড় দিতে পারে আর কর্মাশিয়াল ব্যাংক কি করতে পারে এবং আমরা কি করতে পারি এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা না হলে কাজ টা ভালোভাবে আগাবে না।’

পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, সংকটে থাকা কারখানাগুলোকে কম সুদে নগদ প্রবাহ বাড়াতে এ প্রণোদনা সহায়ক হবে। অন্তত ৫০০টি কারখানা চালু করা গেলে ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সম্ভব। তবে এ সুবিধা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা পান, তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘যাদের কারখানায় কাজ চলছে, কিংবা টাকার জন্য কাজ বন্ধ আছে তাদের জন্য এটা খুব ভালো হবে।’

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘কারখানার নামে টাকা নিয়ে সে টাকা যেন পাঁচার না হয় সে বিষয়ে নজরদারি রাখা উচিত।’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণ বা প্রণোদনার অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার না হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে না, বরং উদ্যোগটির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণ নেয়ার পর তা যদি কর্মসংস্থান তৈরির পেছনে কাজে না লাগানো যায়, তাহলে তো আর সে ঋণ দিয়ে কোনো লাভ হলো না।’

দুর্বল যাচাই-বাছাই ও ব্যাংকগুলোর কার্যকর তদারকি না থাকলে নতুন করে বিতরণ করা ঋণ আবারও খেলাপিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।