কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: কাগজে ১০০ শয্যা, বাস্তবে ৫০,অপারেশন থিয়েটারে ঝুলছে তালা
📷 ছবি: সংগৃহীত
মিয়া মোহাম্মদ সিদ্দিক
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
ফটকে লেখা ‘১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স’। ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন, অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনসহ অবকাঠামোও তৈরি হয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ১০০ শয্যার অবকাঠামো থাকলেও কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখানো চলছে ৫০ শয্যার কার্যক্রম। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় প্রায় দুই বছর ধরে অপারেশন বন্ধ। এ ছাড়া টেকনিশিয়ান না থাকায় বন্ধ রয়েছে এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাম সেবাও।
জানা গেছে, কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যা থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করতে ২০২২ সালের ৬ নভেম্বর অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ শুরু হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে নির্মাণকাজ শেষে হাসপাতালটি হস্তান্তর করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জনের অনুমোদন নিয়ে নতুন ভবনের দুটি ফ্লোর ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বাড়েনি চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জনবল।
হাসপাতালের ৫০ শয্যার জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ ৩৪টি। এর বিপরীতে কর্মরত ১৪ জন। তাদের মধ্যে তিনজন অন্যত্র সংযুক্তিতে থাকায় কটিয়াদীতে সরাসরি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ১১ জন। সংযুক্তি থাকা তিন চিকিৎসক হলেন কনসালট্যান্ট ডা. ফাহিমা আহমেদ, মেডিকেল অফিসার ডা. গোলাম কিবরিয়া ও ডা. তন্নী।
কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ মো. শাহরিয়ার বলেন, ‘হাসপাতালে ১০টি কনসালট্যান্ট পদের ১০টিই শূন্য। বিশেষ করে সার্জারি, গাইনি ও অ্যানেস্থেশিওলজির তিনজন কনসালট্যান্ট খুব জরুরি। এ তিনটি পদে চিকিৎসক না থাকায় সুসজ্জিত ওটি থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে সর্বশেষ সিজারিয়ান অপারেশন হয়েছিল। এরপর থেকে গাইনি, সার্জারি ও অ্যানেস্থেশিয়া বিভাগের প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সিজারিয়ানসহ অন্যান্য অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে।
হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ান। হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে এক্স-রে সেবা চালু হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে টেকনিশিয়ান চলে যাওয়ার পর সেবা বন্ধ হয়ে যায়। আলট্রাসনোগ্রামের মেশিন থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত সেবা চালু নেই। হাসপাতাল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে এখানে আলট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছিল। এরপর থেকে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
এদিকে হাসপাতালে রোগীর চাপ বাড়ছেই। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে বহির্বিভাগে ২ হাজার ২১৫ জন, জরুরি বিভাগে ৪৫০ জন এবং ইনডোর ও অন্যান্য সেবায় ৭৪৯ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। ওই মাসে ৭৮টি নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫৫ থেকে ৬০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর ভর্তি ছিলেন ৬৬ জন।
চিকিৎসা নিতে আসা মরিয়ম আক্তার বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছি। ডাক্তার দেখানোর পর আলট্রাসনোগ্রাম করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে আলট্রাসনোগ্রামের ব্যবস্থা না থাকায় বাইরে গিয়ে পরীক্ষা করাতে হয়েছে।’
নায়েব আলী নামে একজন বলেন, ‘আমার নাতনিকে ডাক্তার দেখানোর পর এক্স-রে করতে বলা হয়েছে। কিন্তু এখানে এক্স-রে হয় না। বাইরে থেকে বেশি টাকা দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে আনতে হয়েছে। আমাদের মতো দরিদ্র রোগীদের জন্য এটি কষ্টের।’
এক্স-রে করতে আসা রোগী বদরুজ্জামান বাবুল বলেন, “১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও এখনো ৫০ শয্যায় কার্যক্রম চলছে। কটিয়াদীর পাশাপাশি আশপাশের কয়েকটি উপজেলার রোগীও এখানে আসেন। ফলে চিকিৎসকদের ওপর চাপ অনেক বেশি।প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দিয়ে ১০০ শয্যার কার্যক্রম জনয দ্রুত জনবল বাড়ানোর সরকারের কাছে দাবি জানাই।”
রোগীর স্বজন প্রিন্স আব্দুল আজিজ বলেন, “হাসপাতালে সিজারের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম আছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসক না থাকায় সিজার করা হচ্ছে না। ১০০ শয্যার হাসপাতাল হলেও বাস্তবে এখনো পূর্ণাঙ্গ ১০০ শয্যার কার্যক্রম চালু হয়নি।”
কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও প. প. কর্মকর্তা ডা. সৈয়দ মো. শাহরিয়ার বলেন, “হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৩৪টি। কর্মরত আছেন ১৪ জন। এর মধ্যে তিনজন অন্যত্র সংযুক্তিতে থাকায় সরাসরি সেবা দিচ্ছেন ১১ জন। অথচ প্রতিদিন বহির্বিভাগে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ জন, জরুরি বিভাগে ১৫০ জনের বেশি এবং অন্তর্বিভাগে গড়ে ৬০ জন রোগী চিকিৎসা নেন।”এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও টেকনিশিয়ান না থাকায় সেবা দেওয়া যাচ্ছে না এবং আল্ট্রাসনো গ্রামের দক্ষ জনবল নেই। “হাসপাতালের ১০টি কনসালট্যান্ট পদই শূন্য। বিশেষ করে সার্জারি,গাইনি ও অ্যানেস্থেশিয়ার কনসালট্যান্ট না থাকায় অপারেশন থিয়েটার থাকা সত্ত্বেও অস্ত্রোপচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “১০০ শয্যার কার্যক্রম চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছে। শূন্য পদগুলোর অন্তত ৫০ শতাংশ জনবল এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পাওয়া গেলে রোগী রেফারের সংখ্যা কমবে এবং এই হাসপাতাল থেকেই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে আরও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাইদুর রহমান বলেন, জনবল সংকট শুধু কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নয়,পুরো দেশেই রয়েছে। তবে সমস্যা সমাধানে কাজ শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন,“ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লেখালেখি করার পাশাপাশি স্থানীয় সংসদ সদস্যও এ বিষয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন। নতুন চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। নিয়োগ সম্পন্ন হলে চিকিৎসক সংকট কাটবে বলে আশা করছি।”
কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, হাসপাতালের সমস্যাগুলো নিয়ে তিনি কাজ করছেন।তিনি বলেন,গত পরশুদিনও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে কথা বলে এসেছি। দ্রুতই এক্স-রে অপারেটর আসবে। গতকালও টিএইচও সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি এগিয়ে যাচ্ছি। এসব সংকট সারা দেশেই রয়েছে।”
ক্যাপশনঃ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ফটক।
মিয়া মোহাম্মদ সিদ্দিক
কটিয়াদি (কিশোরগঞ্জ)প্রতিনিধিঃ