সারাদেশ

চোর’ নয়, পরিস্থিতির শিকার অনিক: তুবার বাবাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পাশে WAB Foundation

চোর’ নয়, পরিস্থিতির শিকার অনিক: তুবার বাবাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পাশে WAB Foundation
📷 ছবি: সংগৃহীত
চোর’ নয়, পরিস্থিতির শিকার অনিক: তুবার বাবাকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে পাশে WAB Foundation

মোহাম্মদ উল্যা

বিশেষ প্রতিনিধি

কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাকে চোর হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, সেই অনিক শিকদারের জীবনের পেছনের গল্প সামনে আসার পর বদলে গেছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। জানা গেছে, অনিক পেশাদার চোর নন; পারিবারিক বিপর্যয়, অসহায়ত্ব ও মাদকাসক্তির কারণে তিনি একসময় স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন।

অনিক শিকদার উজিরপুর এলাকার বাসিন্দা। তাঁর পরিবার একসময় স্বচ্ছল ও সম্মানজনক অবস্থানে ছিল বলে জানা গেছে। তবে বাবার গুরুতর অসুস্থতার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পরিবারটি প্রায় নিঃস্ব হয়ে যায়। পারিবারিক এই সংকট ও মানসিক চাপের মধ্যে অনিক মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁর এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় স্থানীয় একটি মাদকচক্র। ধীরে ধীরে অনিক স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তবে নিজের ভুল উপলব্ধি করে এখন তিনি মাদকমুক্ত হয়ে সম্মানজনকভাবে নতুন জীবন শুরু করতে আগ্রহী।

অনিকের জীবনের এই বাস্তবতা সামনে আসে তাঁর ছোট্ট মেয়ে তুবার মাধ্যমে। বাবাকে নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি দেখার পর WAB Foundation-এর একটি দল উজিরপুর থানা পুলিশের সহযোগিতায় তুবার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

তুবার একমাত্র প্রত্যাশা—তার বাবার জন্য যেন একটি সৎ ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। বাবাকে নিয়ে তার এই আকুতি মানবিকভাবে নাড়া দেয় সংশ্লিষ্টদের।

এরপর অনিক শিকদারের পুনর্বাসনের দায়িত্ব নেওয়ার উদ্যোগ নেয় WAB Foundation। গ্রামাঞ্চলে বসবাস করায় সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহের জন্য অনিক একটি অটোভ্যানের প্রয়োজনের কথা জানান। সেই চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাঁকে একটি নতুন অটোভ্যান কিনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে ছোট্ট তুবার পড়াশোনার দায়িত্বও WAB Foundation গ্রহণ করেছে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে তুবার শিক্ষা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তাঁর বাবাকেও স্বাভাবিক ও কর্মমুখী জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এই মানবিক উদ্যোগে উজিরপুর থানা পুলিশের পক্ষ থেকেও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। উজিরপুর থানার একজন ইন্সপেক্টর অনিকের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সার্বিক সহযোগিতা ও বিষয়টি দেখভালের কথা জানিয়েছেন।

অনিকের ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বাস্তবতা—কোনো অপরাধ বা বিচ্যুত আচরণের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তির বর্তমান অবস্থাকে দেখলেই সবসময় পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। পারিবারিক বিপর্যয়, দারিদ্র্য, মাদকাসক্তি ও অপরাধীচক্রের প্রভাব অনেক মানুষকে স্বাভাবিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তবে অপরাধের দায় অস্বীকার না করে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করাও সমাজের দায়িত্ব।

অনিকের ক্ষেত্রে তাঁর মেয়ের ভালোবাসা এবং একটি মানবিক সংগঠনের উদ্যোগ নতুন করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি করেছে। একটি কর্মসংস্থান হয়তো তাঁর জীবনের গতিপথ পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে; আর তুবার পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া হতে পারে একটি শিশুর ভবিষ্যৎ নিরাপদ রাখার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

সমাজে অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি মাদকাসক্ত ও বিপথগামী মানুষকে আইনগত প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সঙ্গে সঙ্গে, যারা সত্যিই পরিবর্তিত হতে চান তাদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করা গেলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি কমানোর ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

তুবার ছোট্ট আকুতি তাই শুধু একজন বাবাকে ঘিরে নয়; এটি একজন বিপথগামী মানুষকে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার মানবিক প্রচেষ্টার প্রতিচ্ছবি। অনিক শিকদারের সামনে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ—আর সেই পথচলায় পাশে দাঁড়িয়েছে WAB Foundation ও উজিরপুর থানা পুলিশ।