সারাদেশ

মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বিপন্ন সমাজ: নৈতিকতার পুনর্জাগরণই শান্তির পথ

মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বিপন্ন সমাজ: নৈতিকতার পুনর্জাগরণই শান্তির পথ
📷 ছবি: সংগৃহীত
মূল্যবোধের অবক্ষয়ে বিপন্ন সমাজ: নৈতিকতার পুনর্জাগরণই শান্তির পথ

মোহাম্মদ উল্যা

বিশেষ প্রতিনিধি

কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

মানুষের প্রকৃত পরিচয় অর্থ-বিত্ত, ক্ষমতা কিংবা বাহ্যিক আভিজাত্যে নয়; তার সততা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও ন্যায়পরায়ণতায়। অথচ সমাজে যখন সত্যের চেয়ে মিথ্যা, যোগ্যতার চেয়ে তদবির, ন্যায়ের চেয়ে প্রভাব এবং মানবিকতার চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে ওঠে, তখন শুধু ব্যক্তি নয়—পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মূল্যবোধের অবক্ষয় যখন চরণে, জাতি কি করে থাকবে সুখ-শান্তি-আরামে?—এই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা বড় বড় অবকাঠামো মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করলেও নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত্তি দুর্বল হলে সমাজে বাড়তে পারে অবিশ্বাস, অনিয়ম, বৈষম্য ও অস্থিরতা।

মূল্যবোধের অবক্ষয় বলতে শুধু মিথ্যা, প্রতারণা, দুর্নীতি বা স্বার্থপরতাকে বোঝায় না; অন্যায় দেখেও নীরব থাকা, দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া এবং নিজের স্বার্থে ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা ভুলে যাওয়াও এর অংশ। পরিবার থেকেই শিশুর নৈতিক শিক্ষার সূচনা হয়। তাই পরিবারে সততা ও শিষ্টাচারের চর্চা না থাকলে তার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের আচরণে পড়তে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও মূল্যবোধ গঠনের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। শিক্ষা যদি কেবল পরীক্ষার ফল, সনদ ও চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তবে জ্ঞানী মানুষ তৈরি হলেও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরির লক্ষ্য ব্যাহত হতে পারে। নকল, প্রতারণা, সহিংসতা, হয়রানি কিংবা পক্ষপাতের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সততা, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ও পরমতসহিষ্ণুতার বাস্তব চর্চার সুযোগ দিতে হবে।

দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারও মূল্যবোধের সংকটকে গভীর করে। যোগ্যতার পরিবর্তে তদবির, স্বজনপ্রীতি কিংবা অবৈধ সুবিধা প্রাধান্য পেলে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। তাই শুধু নৈতিক বক্তৃতা নয়, প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের সমান প্রয়োগ এবং অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে মূল্যবোধের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল হয়েছে। যাচাই না করে তথ্য ছড়ানো, গুজব, অপমানজনক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সাইবার হয়রানি সামাজিক বিভাজন বাড়াতে পারে। ফলে ডিজিটাল নাগরিকত্বের অংশ হিসেবেও সত্যতা যাচাই, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান এবং দায়িত্বশীল মতপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি।

তবে পুরো তরুণ প্রজন্মকে মূল্যবোধহীন বলে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং তরুণদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, খেলাধুলা, সংস্কৃতি, স্বেচ্ছাসেবা ও নেতৃত্বের সুযোগ বাড়াতে হবে। ইতিবাচক পরিবেশ পেলে তারাই সমাজ পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

মূল্যবোধের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মূল বার্তা—সততা, ন্যায়, দয়া, আমানতদারি ও মানুষের অধিকার—জীবনাচরণে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের শাসন, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, পরিবর্তনের শুরু হতে হবে নিজের কাছ থেকে। অন্যের দুর্নীতি ও অনৈতিকতার সমালোচনা করার আগে নিজের আচরণে সততা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ঘুষ না দেওয়া, প্রতারণা না করা, অন্যায়ের সুবিধা প্রত্যাখ্যান করা, দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং আইন মেনে চলার মতো ছোট ছোট অভ্যাসই বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

একটি শান্তিপূর্ণ ও মানবিক সমাজ শুধু উন্নত অর্থনীতি বা আধুনিক অবকাঠামো দিয়ে গড়ে ওঠে না; তার ভিত্তি হলো ন্যায়, সততা, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা। তাই মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক দায়িত্ব নয়—এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

মূল্যবোধের অবক্ষয় যখন চরণে, জাতি কি করে থাকবে সুখ-শান্তি-আরামে? এই প্রশ্নের উত্তর কথায় নয়, আমাদের প্রতিদিনের আচরণেই দিতে হবে। সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও জবাবদিহিতার চর্চাই পারে সমাজে ফিরিয়ে আনতে আস্থা, শান্তি ও স্থিতিশীলতা।