প্রয়োজনের মাত্র ৪% বন নিয়ে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে তিস্তা বাসি
সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা লালমনিরহাটে ভৌগোলিক ভঙ্গুরতা, তীব্র নদীভাঙন এবং খরা মোকাবিলায় বনায়ন বৃদ্ধি এক বাধ্যতামূলক জাতীয় ও স্থানীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি তথ্যমতে, ১,২৪৭.৩৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলায় প্রায় ১৪ লাখ ২৮ হাজার ৪০৬ জন মানুষ বসবাস করেন। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় যেখানে মোট ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা আবশ্যক, সেখানে লালমনিরহাটে স্থায়ী সবুজ বনাঞ্চল রয়েছে অত্যন্ত নগণ্যযা ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ৪ শতাংশের কাছাকাছি।
জেলার বুক চিরে প্রবাহিত তিস্তা, ধরলা, সানিয়াজান ও রত্নাইসহ প্রায় ১০টি নদীর ৪৫০০ কিলোমিটার জলসীমা এবং ২৮১.৬ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। প্রতি বছর তীব্র নদীভাঙন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং তামাক চাষের জন্য কাঠ পোড়ানোর কারণে হাজার হাজার গাছ বিলীন হচ্ছে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানান, জেলায় গাছপালার ঘনত্ব চাহিদার তুলনায় অন্তত ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ কম। এর সরাসরি প্রভাবে অনাবৃষ্টি, ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
জেলাটিতে জ্বালানি গ্যাসের সুবিধা না থাকায় ইটের ভাটা, চালের চাতাল ও গৃহস্থালির রান্নায় প্রচুর গাছ কাটা পড়ছে। সদর উপজেলার গোকণ্ডা ইউনিয়নের প্রান্তিক কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, "গাছ কেটে ফেলার কারণে চৈত্র-বৈশাখ মাসে গরম সহ্য করা যায় না। তামাক চাষে কাঠ পোড়াতে গিয়ে গ্রামের বড় বড় গাছগুলো শেষ হয়ে গেছে। এখন প্রতিটি পরিবারে ফলজ ও বনজ গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক না করলে ভবিষ্যতে ফসল ফলানোই কঠিন হয়ে পড়বে।"
পরিবেশবিদ ও নদী গবেষণা সংস্থার আঞ্চলিক সমন্বয়ক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, "চরাঞ্চল ও সীমান্তে গাছপালার ঘাটতি থাকায় মাটি ক্ষয় বাড়ছে এবং তামাকের আধিক্যে মাটির জৈব উপাদান নষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে অন্তত ৫০ লাখ নতুন গাছ লাগানো এবং সীমান্ত ও নদীবাঁধ বরাবর 'গ্রিন বেল্ট' বা সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা জরুরি।"
লালমনিরহাট জেলা বন কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রতিনিধিরা জানান, কৃষি-বনায়ন (Agroforestry) ও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় চলতি বছর চরাঞ্চল, সরকারি রাস্তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চারা রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে। তামাকের বদলে পরিবেশবান্ধব ও লাভজনক চাষাবাদে প্রণোদনা দেওয়ার কথা উল্লেখ করে তাঁরা জানান, কেবল সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ আঙিনা ও ক্ষেতের আইলে গাছ লাগাতে সামাজিক ও আইনিভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
নদীভাঙন রোধ ও লালমনিরহাটকে বাসযোগ্য রাখতে জেলা প্রশাসন, বেসরকারি সংস্থা এবং নাগরিকদের যৌথ উদ্যোগে এক 'সবুজ বিপ্লব' গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রয়োজনের মাত্র ৪% বন নিয়ে জলবায়ু ঝুঁকির মুখে তিস্তা বাসি
📷 ছবি: সংগৃহীত