সারাদেশ

সংসার ভাঙনের নেপথ্যে কে? সংকট নারী-পুরুষে নয়, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে

সংসার ভাঙনের নেপথ্যে কে? সংকট নারী-পুরুষে নয়, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে
📷 ছবি: সংগৃহীত
সংসার ভাঙনের নেপথ্যে কে? সংকট নারী-পুরুষে নয়, মূল্যবোধের অবক্ষয়ে

মোহাম্মদ উল্যা
নোয়াখালী জেলা প্রতিনিধি

সংসার—শুধু ইট-পাথরের একটি ঘর নয়; এটি মানুষের স্বপ্ন, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ আশ্রয়। অথচ সেই সংসারই আজ নানা কারণে ভাঙনের মুখে। কোথাও অকারণ সন্দেহ, কোথাও অহংকার; কোথাও তৃতীয় পক্ষের উসকানি, কোথাও মোবাইলের অপব্যবহার; আবার কোথাও দায়িত্বহীনতা, পরকীয়া কিংবা মূল্যবোধের ভয়াবহ অবক্ষয়। একটি পরিবার ভেঙে গেলে শুধু দুটি মানুষের সম্পর্কই ভাঙে না;ভেঙে যায় সন্তানের নিরাপত্তাবোধ, ক্ষতবিক্ষত হয় দুই পরিবারের হৃদয়, আর সমাজ হারায় একটি স্থিতিশীল পারিবারিক কাঠামো।

‘নারীর শত্রু নারী’—কথাটি বহুল প্রচলিত। বাস্তব জীবনের কিছু ঘটনায় এর প্রতিফলনও দেখা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শাশুড়ি, ননদ, বান্ধবী কিংবা প্রতিবেশীর উসকানি, পরনিন্দা, ভুল তথ্য বা অযাচিত হস্তক্ষেপ একটি দাম্পত্য সম্পর্কে বিষ ঢেলে দিতে পারে। কিন্তু এখানেই পুরো সত্য শেষ নয়। একজন পুরুষের বন্ধু, আত্মীয় কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির নেতিবাচক প্রভাবও একইভাবে একটি সংসারে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সংসার ভাঙনের দায়কে শুধু নারী বা পুরুষের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়। আসল সংকট হলো—মানবিকতা, সংযম, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের ক্রমাগত অবক্ষয়।

একটি সংসার ভাঙার শুরু অনেক সময় হয় একটি ছোট সন্দেহ থেকে। কারও একটি কথা, একটি ফোনকল, একটি বার্তা কিংবা একটি মন্তব্য;যাচাই না করেই যখন সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন সম্পর্কের ভিত নড়তে শুরু করে। স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত কথাকে বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া, একজনের কথা অন্যজনের কাছে বিকৃত করে বলা, পরনিন্দা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানি সেই ফাটলকে আরও গভীর করে। যে সম্পর্ক বিশ্বাসে গড়ে ওঠে, সন্দেহ সেখানে নীরব বিষের মতো কাজ করে।

প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু তার অপব্যবহার সম্পর্ককে কঠিনও করে তুলছে। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা অনলাইন যোগাযোগ নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই, যখন প্রযুক্তি মানুষের কাছ থেকে পারিবারিক সময় কেড়ে নেয়, গোপনীয়তা তৈরি করে, অনিয়ন্ত্রিত সম্পর্কের সুযোগ সৃষ্টি করে কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ায়। ভার্চুয়াল জগতের কিছু সম্পর্ক কখনো কখনো বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়েও ভয়াবহ ক্ষত তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে ‘আমার কথাই শেষ কথা’—এই এককেন্দ্রিক মানসিকতা দাম্পত্যের জন্য বিষের মতো। সংসার কর্তৃত্বের জায়গা নয়, সহযোগিতার জায়গা। রূঢ় ভাষা, অপমান, কথায় কথায় ঝগড়া, অন্যের মতামতকে তুচ্ছ করা, ভুল স্বীকার না করা এবং নিজের দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া—এসব আচরণ ধীরে ধীরে ভালোবাসাকে ক্লান্ত করে ফেলে।

পরকীয়া ও বিশ্বাসভঙ্গ সেই ক্ষতকে আরও গভীর করে। নারী কিংবা পুরুষ—যে পক্ষই এমন সম্পর্কে জড়াক, তার অভিঘাত পড়ে পুরো পরিবারের ওপর। তবে কোনো অভিযোগকে সত্য ধরে নিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করার আগে বিষয়টি যাচাই করা জরুরি। সংকট দেখা দিলে প্রতিশোধ নয়, প্রয়োজন সত্য, সংলাপ ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সংসার টিকিয়ে রাখার নামে নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়া যাবে না। যৌতুক, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ কিংবা নিরাপত্তার হুমকি থাকলে নীরব থাকা সমাধান নয়। প্রয়োজন হলে পরিবার, আইনগত সহায়তা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নিতে হবে।

সন্তানদের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। বাবা-মায়ের প্রতিদিনের কলহ, অপমান, বিচ্ছেদের হুমকি কিংবা একে অপরের বিরুদ্ধে সন্তানকে ব্যবহার করা তাদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করতে পারে। তাই সম্পর্কের সংকট থাকলেও সন্তানের সামনে দায়িত্বশীল আচরণ করা জরুরি।

সংসার রক্ষার প্রথম শর্ত ভালোবাসা নয়*;সম্মান ও বিশ্বাস।* ভালোবাসা কখনো কমবেশি হতে পারে, কিন্তু সম্মান থাকলে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ থাকে। স্বামী-স্ত্রীকে বুঝতে হবে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা একই জীবনের সহযাত্রী। মতের অমিল থাকবে, কিন্তু অপমান নয়। অভিমান থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়। ভুল হবে, কিন্তু সংশোধনের সুযোগও থাকতে হবে।

অতএব, নারীকে নারীর শত্রু কিংবা পুরুষকে পুরুষের প্রতিপক্ষ বানিয়ে কোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন নারী-পুরুষ উভয়ের আত্মসমালোচনা, সংযম ও দায়িত্ববোধ। পরনিন্দা, গুজব, হিংসা, উসকানি, অহংকার, অসততা ও দায়িত্বহীনতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

সংসার বাঁচাতে হলে আগে বাঁচাতে হবে মূল্যবোধকে। কারণ ঘর ভাঙার শব্দ বাইরে খুব বেশি শোনা যায় না; কিন্তু সেই ভাঙনের প্রতিধ্বনি বহু বছর ধরে সন্তান, পরিবার ও সমাজের ভেতরে বাজতে থাকে।

নারী নারীর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়;হোক সহযাত্রী। পুরুষ নারীর প্রতিপক্ষ নয়—হোক মর্যাদা ও নিরাপত্তার সহযোগী। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বস্ততা, নৈতিকতা ও মানবিকতার আলোয় প্রতিটি পরিবার হয়ে উঠুক শান্তির ঠিকানা; আর সেই পরিবার থেকেই গড়ে উঠুক একটি সুস্থ, মানবিক ও দায়িত্বশীল সমাজ।