দুই হাত নেই, পা-ই তার ভরসা—অদম্য রাব্বির এসএসসির পর এইচএসসিতেও জিপিএ-৫
দুই হাত হারিয়েও হার মানেনি স্বপ্নের কাছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে পা দিয়ে লিখেই শিক্ষাজীবনে একের পর এক সাফল্যের স্বাক্ষর রাখছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের মেধাবী শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম রাব্বি। এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনের পর এবার ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। তার এই অসাধারণ সাফল্যে আনন্দিত পরিবার, শিক্ষক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
রাব্বি চট্টগ্রাম সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে তার জিপিএ-৫ অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন মহল থেকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো হয়।
এর আগে এসএসসি পরীক্ষাতেও জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজের মেধার পরিচয় দিয়েছিল রাব্বি। দুই হাত না থাকায় পরীক্ষাকেন্দ্রে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়েছিল। সমান উচ্চতার দুটি বেঞ্চ পাশাপাশি বসিয়ে তার ওপর বসে পা দিয়ে লিখে পরীক্ষা সম্পন্ন করে সে। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করে সেই পরীক্ষায়ও কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়।
তবে রাব্বির এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর পরিশ্রম ও অসাধারণ অধ্যবসায়ের ইতিহাস। ২০১৮ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় মুখে কলম ধরে লিখে জিপিএ-৪ দশমিক ৮৩ অর্জন করেছিল সে। পরবর্তী সময়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় পা দিয়ে লেখার অনুশীলন শুরু করে। ধীরে ধীরে আয়ত্ত করে নেয় পায়ের আঙুলের সাহায্যে লেখার কৌশল। এরপর থেকে বিদ্যালয়ের প্রতিটি পরীক্ষায় পা দিয়েই লিখে আসছে সে।
রাব্বির জীবনে নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয় ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর। তখন সে ভাটিয়ারী হাজী টিএসসি উচ্চবিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ওই দিন বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে ভাটিয়ারী ফুটওভারব্রিজ পার হওয়ার সময় বৈদ্যুতিক তারে স্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হয় সে। এতে তার দুই হাত মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়। পরে এক শিক্ষার্থী তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা সম্ভব হয়নি তার দুই হাত।
কিন্তু দুই হাত হারালেও থেমে যায়নি তার শিক্ষাজীবন কিংবা স্বপ্নপূরণের প্রত্যয়। দুর্ঘটনার পর প্রথমে মুখে কলম ধরে লেখার চেষ্টা করে রাব্বি। পরে পা দিয়ে লেখার কৌশল রপ্ত করে নতুন করে পড়াশোনায় মনোযোগী হয়। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে একের পর এক শ্রেণির পরীক্ষায় কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে এবার এইচএসসিতেও জিপিএ-৫ অর্জন করেছে সে।
রাব্বির বাবা বজলুর রহমান জানান, দুর্ঘটনার পর ছেলের চিকিৎসা ও পড়াশোনা চালিয়ে নিতে বিভিন্ন ব্যক্তি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আইসিডিডিআরবির গবেষক ও চিকিৎসক ফেরদৌসী কাদরী রাব্বির পড়াশোনার ব্যয় বহন করে আসছেন। পাশাপাশি ওসমান নামের একজন শিক্ষক বিনা পারিশ্রমিকে তাকে কোচিং করিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতা এবং ছেলের অদম্য মনোবলের কারণেই চিকিৎসার পাশাপাশি তার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।
রাব্বির এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং প্রতিকূলতার কাছে হার না মানার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ অর্জন করে সে দেখিয়েছে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের মেধা, ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নের পরিসর নির্ধারণ করতে পারে না। তার এই সাফল্য নতুন করে সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাবে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে।
দুই হাত নেই,পা-ই তার ভরসা -অদম্য রাব্বি এসএসসির পর এইচএসসিতে ও জিপিএ-৫