সম্পাদকীয়

তোষামোদ নয়, মূল্যায়ন হোক মেধার

তোষামোদ নয়, মূল্যায়ন হোক মেধার
‘সরিষা গাছ আপেল গাছকে তিরস্কার করে বলছে, তুমি জন্ম দিয়েছ এক নিউটনকে, আর আমি জন্ম দিয়েছি হাজারো তেলবাজিকে।’ ব্যঙ্গাত্মক এই বাক্যটি আমাদের সমাজ, রাজনীতি ও প্রশাসনের একটি পরিচিত চিত্র তুলে ধরে। এখানে অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে তোষামোদ বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে মেধা, সৃজনশীলতা ও সত্য বলার সাহস বাধাগ্রস্ত হয়।
বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটনের আপেল পড়ার গল্প আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়। একটি সাধারণ ঘটনা নিয়ে তাঁর কৌতূহল ও গবেষণা মহাকর্ষ সম্পর্কে বিজ্ঞানের ধারণাকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নতুন কিছু আবিষ্কারের জন্য প্রয়োজন যুক্তি, অনুসন্ধিৎসা ও স্বাধীন চিন্তা। কিন্তু যে সমাজে প্রশ্ন করার সুযোগ কমে যায়, সেখানে নতুন চিন্তার পথও সংকুচিত হয়।
সমাজে সত্য বলার সাহস কমে গেলে অন্যায় ও অনিয়মের বিস্তার ঘটে। মানুষ যখন ভয় বা স্বার্থের কারণে সত্য গোপন করে, তখন দুর্বল হয়ে পড়ে সমাজের নৈতিক ভিত্তি। সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা তাই একটি সুস্থ সমাজের অন্যতম শর্ত। অথচ বাস্তবে অনেকেই ক্ষমতাবানদের ভুল নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেন। কেউ সুবিধা হারানোর ভয়ে নীরব থাকেন। আবার কেউ নিজের স্বার্থ রক্ষায় সত্য এড়িয়ে যান।
সমস্যার আরেকটি দিক হলো তোষামোদনির্ভর সংস্কৃতি। কর্মক্ষেত্রে কাজের দক্ষতা ও যোগ্যতার বদলে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া হলে প্রকৃত মেধাবীরা পিছিয়ে পড়েন। পদোন্নতি, দায়িত্ব বণ্টন কিংবা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্যতার অভাব তৈরি হয়। শিক্ষা, রাজনীতি ও প্রশাসনে এমন প্রবণতা প্রতিষ্ঠিত হলে যোগ্য মানুষের মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার পরিবেশ না থাকলে ভুল সংশোধনের পথও বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানে সবাই যদি ঊর্ধ্বতনদের সন্তুষ্ট রাখাকেই প্রধান দায়িত্ব মনে করেন, তবে সেখানে নতুন ধারণা ও গঠনমূলক মতামতের বিকাশ ঘটে না। এর প্রভাব পড়ে কাজের মানে। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র।
এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে যোগ্যতা, সততা ও কাজের মানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুখস্থবিদ্যার পাশাপাশি যুক্তি, প্রশ্ন ও মুক্তচিন্তার চর্চা বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে ভিন্নমতকে অসম্মান নয়, বরং উন্নতির সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে।
একটি সুস্থ সমাজে সমালোচনা শত্রুতা নয়, সংশোধনের পথ। সত্য বলা অপরাধ নয়, বরং দায়িত্ব। আর যোগ্য মানুষের স্বীকৃতি কোনো অনুগ্রহ নয়, তাঁর ন্যায্য অধিকার।
তাই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি তোষামোদকারীদের দিয়ে প্রতিষ্ঠান চালাব, নাকি যোগ্য ও সৎ মানুষকে সামনে আনব। সমাজের অগ্রগতি নির্ভর করে এই সিদ্ধান্তের ওপরই। তোষামোদের সংস্কৃতি যত শক্তিশালী হবে, মেধা তত পিছিয়ে পড়বে। আর মেধার অবমূল্যায়ন মানেই সম্ভাবনার অপচয়। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে তোষামোদের নয়, মেধা, সততা ও ন্যায্যতার চর্চা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।